
পলিথিনের ঝুপড়িতে মানবেতর জীবন, পুনর্বাসনের আশায় বৃদ্ধ লুৎফর রহমান
তপন দাস, নীলফামারী প্রতিনিধি
জীবনের শেষ বয়সে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে রাস্তার পাশে পলিথিন ও খড়কুটো দিয়ে তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘর। নেই বিদ্যুৎ, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে এমন মানবেতর জীবনযাপন করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের বাড়োঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ৬০ ঊর্ধ্ব লুৎফর রহমান চৌধুরী।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ডোমার সড়কসংলগ্ন নটখানা এলাকায় একটি বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে পলিথিন, ছেঁড়া ব্যানার ও খড়কুটো দিয়ে তৈরি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন তিনি। ঝুপড়িটির চারপাশ ঝোপঝাড়ে ভরা। ভেতরে রয়েছে একটি জরাজীর্ণ বিছানা, যার চারদিকে ইঁদুরের গর্ত। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা শীত—কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেই সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই সেখানে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লুৎফর রহমান চৌধুরী সদর উপজেলার কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের মৃত ছলি মামুদ চৌধুরীর ছেলে। একসময় রিকশা ও ভ্যান চালিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। তবে কয়েক বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর ধীরে ধীরে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, সন্তানদের অবহেলা ও অযত্নের কারণে বর্তমানে তিনি চরম অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তাঘাট থেকে পলিথিন ও বিভিন্ন পরিত্যক্ত সামগ্রী কুড়িয়ে সংগ্রহ করেন তিনি। পরে সেগুলো বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে দিন চলে। অনেক সময় মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করতে হয়। খাবার জোটে না নিয়মিত, ফলে প্রায়ই অনাহারে বা অর্ধাহারে থাকতে হয় তাঁকে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লুৎফর রহমান বলেন, “স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমার জীবনটা একেবারে বদলে গেছে। সন্তানরা কেউ আমার খোঁজ নেয় না। ভরণপোষণ তো দূরের কথা, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি, সেটাও জানতে চায় না। গৃহহীন হয়ে অনেকদিন পথে পথে ঘুরেছি। পরে নটখানা কুষ্ঠ হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখান থেকেও চলে যেতে হয়। এখন এই ঝুপড়িই আমার একমাত্র ঠিকানা।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়লেও প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাঁকে। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও নিজের খাবারের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। পরিবার থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নীলফামারী মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা বলেন, “লুৎফর রহমানের জীবনসংগ্রাম আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো একটি ঘটনা। একজন বৃদ্ধ মানুষ জীবনের শেষ বয়সে পরিবার ও সমাজের অবহেলায় রাস্তার পাশে পলিথিনের ঝুপড়িতে বসবাস করবেন, এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। তাঁর জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবান মানুষদের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসা উচিত। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে তিনি অন্তত জীবনের শেষ সময়টুকু মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারবেন।”
পলাশবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মমতাজ আলী প্রামাণিক বলেন, “জীবনযুদ্ধে প্রতিদিন সংগ্রাম করছেন লুৎফর রহমান। তাঁর চিকিৎসা, খাদ্য ও থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা করা গেলে তিনি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন। সন্তানদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহায়তার প্রত্যাশায় আছেন।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে মৌলিক অধিকার পাওয়ার আশায় বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্বারস্থ হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সহায়তা পাননি এই বৃদ্ধ। ফলে বয়সের শেষ সময়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অবহেলার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাঁকে।
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে প্রশাসনের উদ্যোগে লুৎফর রহমানের পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোকেও তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটি নিরাপদ আশ্রয়, দুবেলা খাবার এবং সামান্য সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন লুৎফর রহমান। এখন দেখার বিষয়, সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর সেই ন্যূনতম মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আজ রোজ শনিবার ১৩-জুন ২০২৬.